পর্ব -১
রাত তখন ন'টা বেজে পঞ্চাশ,অন্ধকার এই রাত্তিরে গাড়ির সম্মুখে দাঁড়িয়ে রইলো দু'জন ছেলে মেয়ে।কোনো একটা বিষয় নিয়ে তাদের খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে।মেয়েটি চিন্তিত হয়ে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো,
-"মৃন্ময় সারা আসতে ঠিক কতক্ষণ লাগবে?"
তীরের কথায় মৃন্ময়ের ধ্যান ভাঙ্গলো।সে বললো,
-"কিছু বলেছিস তীর?"
-"বললাম সারা আসবে কখন রাত দশটা বেজে গেল বলে।"
-"ম্যাসেজে বললো আরো নাকি পাঁচ মিনিট লাগবে আসতে।"
মৃন্ময় এর কথায় মাথা নাড়িয়ে ফের তীর চিন্তিত হয়ে আওড়াল,
-"নোহা, তিয়াস আর জীবন কোথায় গেল?এখানেই তো ছিল ওরা।"
-"সারাকে লেট করে আসতে দেখে তারা তিনজন এখানেই দেখ আশেপাশে ঘুরাঘুরি করছে।"
-"চল ওদের খুঁজে নিয়ে আসি।"
-"ঠিক আছে চল।"
মৃন্ময় বললো।তারপর তীর আর মৃন্ময় তাদের তিনজনকে অনেকক্ষণ খুঁজাখুঁজির পর কোথাও পেল না।এবার তীর রেগে গেল।রেগে বললো,
-"মৃন্ময় ওরা কোথায় গেল?"
-"জানি না রে বাবা।রেগে যাস না।চিৎকার করে নাম ধরে ডেকে দেখি সাড়া দেয় কিনা।"
-"আরে তাই তো।এটা তো এতক্ষণ মাথায় আসেনি আমার।"
তীর চিন্তিত হয়ে বললো।তীরের কথায় হাসলো মৃন্ময়। এরপর দু'জন চিল্লাচিল্লি শুরু করলো ওদের নাম ধরে।
-"নোহা নোহা।কোথায় তোরা?"__তীর চিৎকার করে বলছিল।এবার মৃন্ময় চিৎকার করে বললো,
-"তিয়াস-জীবন তোরা কোথায়?যেখানেই আছিস সাড়া দে বলছি।সামনে ফেলে তোদের সবার খবর করে ছাড়ব বলে দিচ্ছি।সাড়া দে তিনজন।"
আচমকা পেছন থেকে হাসির শব্দ আসতেই দু'জন পিছনে তাকালো।নোহা,তিয়াস আর জীবন হেসে কুটিকুটি হচ্ছে তাদের এভাবে চেঁচাতে দেখে।তাদের দাঁত বের করে হাসতে দেখে তীর আর মৃন্ময় রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।পর পর তীর রেগে বলে উঠে,
-"হাসি পাচ্ছে খুব তোদের।কতক্ষণ ধরে ডেকে যাচ্ছি তোদের সাড়া দিস নি কেন তোরা?"
-"আরে তীর রাগ করছিস কেন।সারাকে আসতে না দেখে আমরা তো একটু চারপাশটা ঘুরে আসলাম কেবল।"
তাদের কথার মাঝে পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
-"ঝগড়া শেষ হলে চল এবার।"
সবাই একসাথে পিছনে তাকালো।তীর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে খরখরে গলায় বলে উঠলো,
-"এখন রাত দশটা বিশ মিনিট বেজে চলেছে...না আসলেও পারতি সারা।"
-"রাগ করিস না তীর।আমার মা এর ব্যাপারটা তো জানিস তোরা।একা কোথাও ছাড়েনি আমায়।কিছুতেই এই ভার্সিটিতে পড়তে দিবে না বলে কান্নাকাটি শুরু করে দিল তারা।বাবাকে দিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এখন আসলাম।স্যরি গাইস।"__সারা অসহায় ভাবে বললো।সবাই কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকার একসাথে বলে উঠলো,
-"ইট’স ওকে মিস সারা।"
তারপর একে একে সবাই গাড়িতে উঠে বসলো।এক ঘন্টা ভালোভাবে গাড়ি ড্রাইভ করল মৃন্ময়।হঠাৎ করে গাড়ির নিজে নিজে থেমে গেল।গাড়ি থামতে দেখে নোহা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
-"কিরে মৃন্ময় গাড়ি থামালি কেন?"
-"আমি গাড়ি থামাই নি।গাড়ি নিজে থেকে থেমে গেছে নোহা।"
-"হোয়াট?"__একথা শুনে তীর হালকা চেঁচিয়ে বললো।
-"মৃন্ময় তুই এত রাতে আমাদের সাথে মজা করছিস?"__জীবনও বিরক্ত হয়ে বললো।
-"আজব তো। আমি তোদের সাথে মজা করতে যাব কেন।আমি সত্যি বলছি গাড়ি হঠাৎ করেই থেমে গেল।"__মৃন্ময় কর্কশ গলায় জবাব দিল।
(স্কুল লাইফ থেকে ই তারা ছয়জন বেস্টফ্রেন্ড।এই পর্যন্ত সবাই একসাথে ই সবকিছু করে আসছে।একই কলেজে সবাই পড়াশোনা করেছে।এখন কলেজ শেষ করে একই ভার্সিটিতে তারা ভর্তি হলো।তাদের ছয় জনের মাঝে সারা অনেক ভীতু।)
আচমকা সারার ভয়ার্ত গলা শুনতে পেল সবাই।
-"সা...সামনের গাছটার দিকে তাকা সবাই।"
সবাই সামনে তাকাতেই কিছুটা ভয় পেল।সামনে একটা বড় বটগাছ।বটগাছটির চারিপাশ ধোঁয়া বের হচ্ছে।গাছটার প্রায় তিন হাত পিছনে ই তাদের গাড়িটি দাঁড়িয়ে।নোহা সারার কথায় বলে,
-"গাছ ই তো।"
-"আ ,,,,, আর কিছু দেখছিস না তোরা'।__ফের সারার ভীতু গলা শোনা গেল।
-"না তো।গাছ ছাড়া আমাদের আর কিছুই চোখে পড়ছে না।"__মৃন্ময় ভালোমতোন পরখ করে বললো।
-"কিন্তু আ ,,,, আমি তো আরো একজনকে দেখতে পাচ্ছি।"__সারা ভয়ে ভয়ে বললো।
সারার আবোলতাবোল কথায় বিরক্ত হয়ে তিয়াস বলে উঠলো,
-"এই মৃন্ময় গাড়ি চালা তো তুই।সারার মাথা গেছে। কিসব উল্টাপাল্টা বকছে ও।"
-"আমি সত্যি বলছি তিয়াস।আ ,,,,, আরে এ ,,,, এটা তো একটা মেয়ে।"__সারা গাড়ির জানালার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো।এবার তীর কিছুটা রেগে বললো,
-"তোর মাথাটা গেছে। আমরা কেউ ই কিছু দেখতে পাচ্ছি না সারা।"
-"যেও না।যেও না তোমরা।এই পথ পেরোলেই তোমাদের সবার মৃত্যুর ঘন্টা বাজতে শুরু করবে।তোমরা সবাই মরবে।তোমরা কেউ ওখান থেকে বেঁচে ফিরবে না।সাবধান করছি তোমাদের।যেও না।সাবধান।"
সারার কর্ণে এসে পৌঁছালো একটি মেয়েলি কন্ঠস্বর কথাটি শুনে সারার ভয়ে কাঁপানি উঠে গেছে।সারা ছাড়া কেউ শুনেনি কথাটি।সারাকে এভাবে কাঁপতে দেখে জীবন বলে,
-"কিরে সারা কাঁপছিস কেন?"
-"ম ,,,, মৃন্ময় গ ,,,, গাড়ি ঘুরা।আমি বাড়ি যাব।আমার খুব ভয় লাগছে।"
-"নিজে একনাম্বারের ভীতু।সাথে আমাদেরও ভয় লাগাচ্ছে।চুপ থাক তো সারা।চুপচাপ আমাদের সাথে চল।"__তীর বললো।
-"পাগলের মতো এসব কি বলছিস সারা।ভিতুর ডিম একটা।চুপ করে বসে থাক।"__এবার মৃন্ময় বললো।
আবারো সারার জানালার বাহিরের দিকে চোখ গেল।একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটার জামাকাপড় অনেক পুরাতন।ছেঁড়া ফাটা।সারা মেয়েটার মুখের দিকে তাকালো।মেয়েটার মুখ রক্তশূণ্য।চোখের নিচ কালো হয়ে আছে।চুলগুলো উসকোখুসকো।চোখ জোড়া রক্তবর্ণ হয়ে আছে।টলমল দৃষ্টিতে সারার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি।মেয়েটা দেখতে ভয়ানক হলে ও মেয়েটার চোখের দিকে তাকাতেই সারার কেমন জানি মায়া লাগলো।
এদিকে কিছু মুহূর্ত পর আচমকা মৃন্ময় গাড়ি স্টার্ট দিতেই গাড়ি চলা শুরু করলো।গাড়ি বটগাছটা পেরোতেই সারার কানে ফের একই কথা বেজে উঠল,
-"যেও না।যেও না।না হলে আমার মতো তোমাদেরও সবার ভয়ানক মৃত্যু হবে।"
সারা কেঁপে উঠল কথাটি কানে আসতেই। সারা তিয়াসের হাত শক্ত করে ধরে নিজেকে একরকম গুটিয়ে নিল।গাড়ি ঠিকঠাক মতো চলতে দেখে মৃন্ময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আওড়াল,
-"যাক বাবা অবশেষে গাড়ি চলছে।"
