#নিভৃতে_যতনে
#পার্ট_০২
সেন্টার থেকে বেরিয়ে ইবাদত হাঁটা দিল লেকের দিকে। ঠিক সেন্টারে পেছনেই লেক। তখনই আকাশ ভেঙে ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি নামা শুরু করলো, ধুয়ে নিয়ে গেল তার চোখের বেয়ে পড়া জল। ভিজতে ভিজতে গিয়ে বসলো একটি বেঞ্চে। পানির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে গেল বাবা মেজর জেনারেল এনায়েত হোসেনের কথা।
হাস্যোজ্জ্বল মানুষটির জান প্রাণ ছিলো তার একমাত্র মেয়ে ইবাদাত। মেয়েকে ছাড়া একদন্ডও কোথাও থাকতে চাইতেন না তিনি। ইরাক আমেরিকা যুদ্ধের সময় সিক্রেট মিশনের জন্য যখন তাকে সিলেক্ট করা হলো প্রথমেই নাকচ করে দিলেন তিনি শুধু মেয়েকে ছেড়ে থাকতে হবে ভেবে। কিন্তু মেয়ের সুপার হিরো বাবা চাই তাই শেষ পর্যন্ত মা মেয়ের জোড়াজুড়িতেই রাজি হয়ে গেলেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! গেলেন প্লেনে চড়ে ফিরলেন কফিনে।
লাশ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছিলো ইবাদাত আর তার মা ইনশিয়া হামিদ। যত বড় তুখোড় উকিলই হোন না কেন স্বামী সংসারের কাছে তিনি নিতান্তই নরম মনের মানুষ ছিলেন। স্বামীর লাশ দেখা মাত্রই স্ট্রোক করে বসেন আর স্বার্থপরের মত মেয়ের কথা না ভেবেই স্বামীর সাথে পাড়ি জমান পরপারে।
একা নি:সঙ্গ ইবাদাত চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে বাবা মায়ের শেষ বিদায়। বাবা মিশনে যাবার আগে মেয়েকে শেষ একটা চিঠি লিখে যান। আজও যেন সেই চিঠির কথাগুলো ইবাদাতের কানে বাজে।
প্রিয় মা ইবাদাত,
তুমি কি জানো তোমার নাম ইবাদাত কেন রাখা হয়েছে? আমাদের বিয়ের দীর্ঘ ১৪ বছর পরে অনেক চেষ্টা, অনেক ইবাদাত, আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করার পরে তোমার জন্ম। তোমার মা তো একদম ভেঙ্গে পড়েছিলেন, সে তো তোমাকে বাচাতে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। শুধু আমি ধৈর্য্যহারা হইনি, আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো আল্লাহর উপর। তুমি এই পৃথিবীতে এলে, আমাদের চোখের মনি হয়ে রইলে। আমি কোথাও তোমাকে ছাড়া একদম থাকতে পারিনি আর। অফিসে যেয়ে তোমাকে দেখবো বলে বাসায় সিসি ক্যামেরাও লাগালাম। সে তোমাকে ছেড়ে দূর দেশে পাড়ি দিচ্ছি, শুনছি সেখানে নাকি আমাকে মোবাইল ইউজ করতে দিবে না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা তোমাকে ছেড়ে যেতে, তবুও তোমার সুপারম্যান বাবা হতে আমি যাবো।
জানি না ফিরতে পারবো কি না তবে মনে রেখো তোমার সাথে তোমার বাবা মায়ের দোয়া সারাজীবন আছে। তোমার যেকোন বিপদে, মন খারাপের দিনে তোমার বাবা মা তোমার পাশে ঢাল হয়ে রইবে। ভালোবাসি মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
ইতি তোমার
সুপারম্যান বাবা।
চিঠির কথা মনে পড়তেই দুচোখ ভেঙে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে নামলো চোখের বারিধারা। হাউমাউ করে কাদলো ইবাদাত। ভাগ্যিস বৃষ্টির কারণে আশেপাশে কেউ নেই। হঠাৎ করে ধপ করে কেউ তার পাশে বসলো। চমকে পাশ ফিরে চাইলো সে। দেখলো আজানকে। অবাক হয়ে গেল। আজানও পাশ ফিরে নিরব দৃষ্টিতে তাকালো ইবাদাতের দিকে। কালো চোখ জোড়া যেন গ্রাস করছে তাকে এই মুহুর্তে।
আজান বললো, " স্যরি। আসলে গরমে আর রাগে মাথা ঠিক ছিলো না, একটু বেশি বলে ফেলেছি। অবশ্য দোষ কিন্তু আপনারও ছিলো আমাকে লবন পানি খাওয়ালেন তখন!"
তার কপট রাগ দেখে হেসে দিলো ইবাদাত। মুচকি হেসে পাশে ফিরে অন্যদিকে চেয়ে রইলো কিছু না বলে। আজান তখন মুচকি হেসে বললো, " যা হবার তা তো হয়েই গেছে, শোধ বোধ। আমরা তো সম্পর্কে বিয়াই বিয়াইন এখন কি বন্ধু হয়ে যেতে পারি না?"
হাসলো ইবাদাত," জুতা চোরকে বন্ধু করতে আপনার প্রেস্টিজে বাধবে না তো মেজর সাহেব? আপনি কত বড় সম্মানিত ব্যক্তি আপনার বন্ধু হবে কিনা একজন জুতা চোর, বস্তি মার্কা ব্যক্তি? লোকে ছি ছি করবে যে!"
দাতে দাত চেপে খোচাটা হজম করলো আজান। হেসে বললো, " সমাজকে চোর মুক্ত করা আর্মি পারসোন হিসাবে আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বন্ধুত্ব করে দেখতে চাচ্ছি তাকে আয়ত্বে আনা যায় কি না!"
এবার রেগে গেল ইবাদাত। উঠে চলে আসতে চাইলো, তার পিছু নিলো আজান। পিছু পিছু যেতে যেতে বললো, " আরে আরে এই কথা না বলে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? ফোন নাম্বারটা তো দিয়ে যান! এই জুতা চোর! এই! কি যেন নাম? ইবাদাত?"
জুতা চোর শুনে ইবাদাত পিছন ফিরে চোখ কটমট করে চাইলো। বললো, "আপনাকে দিবো ফোন নাম্বার? এই জীবনে না।"
" লাগবে না, আমি জোগাড় করে নিবো। বলি লিফট তো নিতেই পারেন, নিজের দিকে চেয়ে দেখেছেন? ভিজে তো একাকার। সব কিন্তু ফিতা ছাড়াই চোখ দিয়ে মাপা যাচ্ছে।"
অবাক চোখে চাইলো ইবাদাত। একটা মানুষ এত ঠোট কাটা হয় কিভাবে? তবে কিছু বললো না আসলেই তার অবস্থা খারাপ আর রাস্তায় কোন রিক্সা গাড়ি কিছুই নেই। চুপচাপ আজানের গাড়ির পাশে এসে দাড়ালো। আজানও মুচকি হেসে গাড়ির ডোর খুলে দিলো। মনে মনে ভাবলো যাক ম্যাডামের বাড়ির ঠিকানাটা জানা যাবে।
