Type Here to Get Search Results !

নিভৃতে _যতনে(পার্ট-১)


 #নিভৃতে_যতনে 

#পার্ট_০১


বিয়ে বাড়ির কোলাহল। সেই রকম টানাটানি চলছে বরের জুতো জোড়া নিয়ে। এদিকে বর কাঁদো কাঁদো মুখে বসে আল্লাহর নাম জপছে যেন, তার জুতো জোড়া বাড়ি ফেরা আগ পর্যন্ত অক্ষত থাকে। তবে মনে হয় শেষ রক্ষার হবে না যে পরিমাণে টানাটানি চলছে! হলোও তাই শেষ রক্ষা আর হলো না জুতো ছিড়ে দু'ভাগ হয়ে দুই পক্ষের হাতে চলে গেল।


উপরের অংশ রয়ে গেল কনে পক্ষের হাতে আর শুক তলা খুলে চলে গেল বরপক্ষের কাছে। বর দিল ভেউ ভেউ করে কেঁদে। শুধু কাঁদলেও ভালো ছিল হঠাৎ করে ঠাস করে একটা আওয়াজ হল। চারিদিকে নিস্তব্ধ ছেয়ে গেল। 


বরের ছোট ভাই মেজর আজান কনের বান্ধবী ইবাদাতকে চ ড় মেরেছে। যেই সেই চ ড় নয় একেবারে ঠাটায়া থা প্পড়। এখন সে দিনে তারা দেখা শুরু করেছে।


 ঘটনা হলো এই, যখন জুতা ছিড়ে গেল তখন ইবাদাত জুতাসহ গিয়ে পড়ে মেজর উপরে। তার লিপস্টিক লেগে গেছে আজানের গালে। জনসম্মুখে যাকে বলে চু ম্মা তা দিয়েছে ব্যাচেলার মেজরকে। আজানের মেজাজ গেল বিগড়ে মেরে দিল চড়! এইজন্যই সে মেকআপ করা মেয়ে মোটেও পছন্দ করে না। যত্ত সব! ভেজা টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে গালের চামড়া উঠে যাওয়ার উপক্রম। 

ওই দিকে মাথা ধরে মেঝেতেই বসে পড়েছে ইবাদাত। জীবনে ফুলের টোকাও খাইনি সেইখানে এমন রাম থা প্পর। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে তার। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালো সে ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে রইল আযানের দিকে যে চেপে ধরল তা শেরোয়ানির কলার। 

চেঁচিচে বলে উঠলো, "হেই ইউ! কত্ত বড় সাহস আপনার আমার গায়ে হাত তোলা? আমি কি ইচ্ছে করে পড়েছিলাম নাকি আপনার উপরে? এতটুকু ম্যানারস জানেন না? একটা মেয়েকে এইভাবে মেরে দিলেন?"

 এমনিতেই খেপে ছিল আজান। সেন্টারে আসার পরে গেট ধরার নাম করে একবার চাদাবাজি করেছে, শরবতের নাম করে খাইয়েছে লবন পানি, এখন ভাইয়ের জুতা ছিড়েছে আবার তার উপরে পড়েছে, কিস করেছে, এখন আবার তার কলার ধরা? আজ এই মেয়ের হচ্ছে!

 সেও গর্জে উঠলো," ম্যানার লেস গার্ল! বস্তি কোথাকার! ইনসেন! রূপের নাই বালাই আটা ময়দা মেখে চালাই?

 এই শিক্ষা দিয়েছে বাবা মা? ছেলেদের গায়ে হাতাহাতি করা? জনসম্মুখে চুমু খাওয়া? ব্যবহার এই বংশের পরিচয়। ডাকো তোমার বাবা মাকে। দেখি তাদের চেহারাখানা কেমন সন্তান জন্ম দিলেন কেমন শিক্ষা দিলেন তাকে নিজের চোখে এসে দেখুক তারা। চাদাবাজ, জুতা চোর কোথাকার!"


কথাগুলো শুনে ইবাদাতে চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। হয়তো থাপ্পরেও ততটা ব্যথা পায়নি যতটা পেয়েছে কথাগুলো শুনে। সে অজান্তে আজ নিজের মৃত বাবা-মাকে অনেকগুলো বাজে কথা শুনিয়ে ফেলল, যা তাদের প্রাপ্য ছিল না। চুপ করে সেখান থেকে মাথা নিচু করে চলে গেল।


 ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করতে প্রথমেই বেসিনের সামনে যে টিস্যু দিয়ে ঠোঁটের লাল লিপস্টিক টি মুছে ফেলল। যার জন্য এত কান্ড। তারপর মুখে পানি দিয়ে মেকাপ ধুয়ে ফেললো। মেকাপ ধোয়ার পরে বেরিয়ে পড়েছে তার স্নিগ্ধ রূপের নমনীয় চেহারাটা, চোখ হয়ে আছে রক্ত জবার মত লাল। 


যখন নিচে আসলো, শুনতে পেল একচোট হৈচৈ হাঙ্গামা।

 কনের মামা বলছেন," এই বিয়ে হবে না। যেই বাড়ির ছেলে না জেনে না শুনে একজন এতিম মেয়েকে বাবা-মা তুলে কথা শুনাতে পারে, সেই বাড়িতে মেয়ে তারা দিবেন না। ছেলের ভাইকে ইবাদতের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। "


ঐদিকে গো ধরে আছে আজানও। দরকারে ভাইয়ের বিয়ে দিবে না তবুও মাফ চাইবেনা ওই মেয়ের কাছে। বিয়ে ভেঙে যায় যাক।


এই ঝগড়ায় বর কোনে জান যায় যায় অবস্থা দুজনেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিয়েছে। সাওম আর জান্নাতের (বর কনের) সাত বছরের প্রেম। কলেজ থেকে তারা পরিচিত। ভার্সিটির পার করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, বাবা মাকে ম্যানেজ করে বিয়ে করতে করতে চলে গেছে সাতটি বসন্ত তাদের জীবন থেকে। এখন যদি বিয়ে ভেঙে যায় তো দুজনেরই মরা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। 


কথাগুলো শুনে ইবাদতের বুকের ভিতর দামামা বেজে উঠলো। যে বান্ধবী তার এই নিঃসঙ্গ জীবনে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করেছে যে পরিবার তাকে মেয়ের মত আগলে রেখেছে আজ তার জন্য তাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে?

 না সে বেঁচে থাকতে তা কিছুতেই হতে দিতে পারে না। 


 ঝগড়ার মাঝখানে দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিলো, "ব্যাস!"


তারপর মামা আর আজানের ফিরে দুই হাত জোড় করে বলল, " দেখুন আমি এই বিয়ের একজন নগণ্য অতিথি মাত্র। আপনার সাথে যা করেছি তা নিছকই কি একটি দুর্ঘটনা। ইচ্ছাকৃতভাবে কারো গায়ে পড়ে সবার সামনে চুমু খাওয়ার মত মেয়ে আমি নই। আর নাই আমার বাবা-মা আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছেন। আমি একজন এক্স জেনারেলের মেয়ে। অনেক সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন তিনি। এই ঘটনার সাথে কোনভাবেই বর কনে জড়িত নয় তাই হাতজোড় করছি আমার কারণে তাদের সম্পর্কটি ভেঙে দিবেন না। আমার অপরাধের জন্য আমি ক্ষমা চাইছি যে শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে নিবো তবুও এই বিয়েটা হয়ে যেতে দিন।"


তারপর সাওমের দিকে ফিরে বললো, "দুলাভাই অনেক অনেক দুঃখিত আর ক্ষমাপ্রার্থী জুতা ছিড়ে ফেলার জন্য। আমি এক্ষুনি আমাদের লুটের টাকা মানে ওই গেটে যেটা নিলাম আর কি ওইটা দিয়েই একজোড়া জুতা নিয়ে আসছি একটু অপেক্ষা করুন। আপনি শুধু ফটাফট কবুলটা বলে ফেলুন তো আমার বিচার না হয় পরে করবেন।"


মুচকি হেসে ইবাদত দৌড়ালো জুতা আনতে। তার আগে কনের মামাকে বলে গেল কাজিকে ডাকে আনার জন্য।


তার যাওয়ার পানে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো আজান। একটু বোধ হয় বেশিই বলে ফেলেছে। এখন গিলটি হচ্ছে। নাহ মেয়েটার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।


 যতক্ষনে ইবাদত ফিরেছে ততক্ষণে জান্নাতের বিয়ে সম্পন্ন। তারা কবুল বলে ফেলেছে। সবাই খাওয়া দাওয়া করছে। দৌড়ে এসে ইবাদত জুতাগুলো নিজের আঁচল দিয়ে মুছে বরের পায়ে পরিয়ে দিল আর জান্নাতকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটি চুমু দিলো। মুচকি হেসে সবার চোখের আড়ালে না খেয়েই বেড়িয়ে পড়লো সেন্টার থেকে। 


তার চলে যাওয়াটা কারোই চোখে পড়লো না শুধু একজনের নজর এড়ালো না, বাজপাখির নজর তার। পড়েছে ছোট্ট টিয়া পাখির উপর, এবার তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে।

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.