![]() |
#তোমাকে_ঘিরে
#পর্ব_১০
রিসিপশনের পরে দেখতে দেখতে কেটে গেল ছয়টা মাস। সবকিছু ঠিকঠাক। আয়ান আর আফজার সময় কাটছে বেশ সুখে। মিতুল আর রিফাও তাদের সংসারে বেশ ভালোই আছে। মিতুল মন থেকে মেনে নিয়েছে রিফাকে। সত্যি এমন মেয়ে আজকাল দেখা যায় না সচরাচর। মিতুলের বাবা মা তো তাকে মেয়ের মত ভালোবাসে। বিয়ের পরেও রিফাকে জব করতে তারাই বলেছেন। একজন মেয়ের জন্য সাবলম্বী হওয়া খুব জরুরি। ভবিষ্যত কেমন হবে কেউ জানে না।
এদিকে আয়ান নতুন নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। তার সাথে কাজ করতে করতে আফজাও হিমসিম খাচ্ছে। পিএ বলে কথা! সব তাকেই সামলাতে হয় সাথে ইদানিং আয়ানের আলহাদি পনা যোগ হয়েছে। নাজেহাল করে ছাড়ে একদম!
একদিন খুব জরুরী একটা ফাইল নিয়ে নক না করেই ঢুকে আয়ান কেবিনে। ঢুকেই থমকে যায় সে।
" স্যার এই ফাইলটাতে!"
মুখের কথা মুখেই রয়ে যায় তার।
"স্যরি আমার নক করে আসা উচিত ছিলো। পরে আসছি।"
কেবিন থেকে বাইরে এসে বাহাদুরকে ডাকতে থাকে।
"বাহাদুর ভাই! বাহাদুর ভাই! এই ফাইলটা স্যারের রুমে দিয়ে আসুন। যাবার আগে অবশ্যই নক করে নিবেন। বলা তো যায় না কেবিনে কি অবস্থায় আছেন? স্যারকে বলবেন ফাইল চেক করা হয়েছে উনি যেন একটা সাইন করে দেন আর আমার শরীর খারাপ লাগছে আমি হাফ বেলা ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। রিকুজেশন ম্যানেজার স্যারকে জমা দিয়ে যাচ্ছি।"
এই বলে রাগে লাল হয়ে গট গট করে বের হয়ে যায় আফজা। মিতুলের রুমে যেয়ে রিকুজিশন জমা দিয়ে সোজা বের হয়ে যায়। মিতুল কয়েকবার জিজ্ঞাসা করে কি হয়েছে? সে উত্তর দেয় না। হেসে একটা বাহানা দিয়ে বের হয়ে যায়।
বাহাদুরের মুখে সব শুনে কেবিন থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আসে আয়ান তবে আফজাকে খুজে পায় না। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে রিসিপশনের সোফায়। কি থেকে কি হয়ে গেলো? কি করবে সে এখন? আফজা প্রচন্ড অভিমানী মেয়ে কিভাবে সামলাবে সবটা?
আসলে কি হয়েছিলো কেবিনে?
আয়ানের ফরেনার একজন বান্ধুবী বাংলাদেশে এসেছে। সে অফিসে আসে। আফজা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেয় কারণ আয়ান বিদেশে পড়েছে আসতেই পারে ফ্রেন্ড। তবে লাইকা নামের এই ফ্রেন্ডটি যে বিদেশে থাকাকালীন আয়ানকে পছন্দ করতো আর তাকে পেতে চাইতো সে টা আফজার জানা ছিলো না। আয়ানের অতীত সম্পর্কে আফজা আসলে তেমন কিছুই জানে না আর তেমন আগ্রহও দেখায় নি। লাইকা এসে সব ফ্রেন্ডসদের গ্রুপ ভিডিও কল দিয়ে কথা বলতে থাকে আয়ানের পাশেই চেয়ার নিয়ে বসে। এক সময় সে বলে সেলফি তুলবে আয়ান রাজি হলে ক্যামেরা অন করে আয়ানকে গালে কিস করে বসে আর ঠিক ওই সময়ই আফজাও কেবিনে ঢুকে।
পরে আসছি বলে যখন সে বের হয় আসতে যাবে আয়ান আটকায় তাকে।এক্সপ্লেইন করতে চাইলে এক কথায় দুই কথায় দুইজনের ঝগড়া লেগে যায়। আয়ান ক্ষেপে যেয়ে লাইকার সামনেই আফজাকে চড় দিয়ে বসে। লাইকা খুব উপভোগ করে পেছনে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে আর আফজাকে ইশারায় বোঝায় যে আসলে সে গেইনার আর আফজা ফেইলার।আফজা এইসব নিতে পারে না। রেগে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর তো সবই জানা।
মিতুল লাইকাকে চিনতো আর তার মনোবাসনা সম্পর্কেও জানতো। আয়ানের কাছে সবটা শুনে সে রেগে যায় আর লাইকাকে অনেক বকাঝকা করে। লাইকা রেগে অফিস থেকে চলে যায়। সে চলে গেলেও আয়ানের জীবনে যে ঝড় সে তুলে দিয়ে গেছে তা থামানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই বিষয়ে আয়ান আর মিতুল দুইজনেই অজানা।
লাইকা আয়ানের ডায়েরী থেকে যেখানে সব এমপ্লয়ীদের হোয়াটস এ্যাপ নাম্বার থাকে সেখানে থেকে আফজার নাম্বার নিয়ে এই সেলফি সহ তার আর আয়ানের এডিট করা কিছু ভালগার ছবি আফজার কাছে পাঠায়। নিচে লিখে দেয়,
"আমরা আগে থেকেই লিভিংয়ে ছিলাম তোমার জন্য আয়ান আমাকে ইগনোর করছে। তুমি যদি তাকে একটু বলো আমি এখন দেশে আছি আমার সাথে টাইম স্পেন্ড করতে তারপরে তো সে তোমারই রইলো তাহলে খুব ভালো হয়। না হলে আমাকে আবার ফোর্স করতে হবে, কোয়ালিটি টাইম এঞ্জয়ের জিনিস ফোর্স করে মজা নেই।"
এইসব দেখে আফজার মাথা ঘুরতে থাকে। এমনিতেই সে একটু অসুস্থ কিছুদিন থেকে কাজের চাপে খেয়াল ছিলো না। সে রিক্সাতেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। আশে পাশের লোক তাকে ধরে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার আইডি থেকে ইমারজেন্সি কন্টাক্টে দেয়া আয়ানের নাম্বারে কল দিয়ে আসতে বলে।
কল পেয়ে আয়ান, মিতুল, রিফা তিনজনেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে হাসপাতালে। জানতে পারে অতিরিক্ত স্ট্রেসে জ্ঞান হারিয়েছে, সে প্রেগনেন্ট তিনমাস চলছে। তবে জ্ঞান হবার পরে থেকেই খুব কাদছে। তারা বাবাকে কল করে আসতে বলছে।
আয়ান চুপচাপ শুনলো। নার্সকে জিজ্ঞাসা করলো, আমার ওয়াইফকে জানিয়েছেন প্রেগনেন্সির কথা? সে সম্মতি জানিয়ে বলে জানার পর থেকে আরো বেশি কাদছে।
আয়ান হুম বলে আবার চুপ হয়ে যায়। তারপর রিফাকে ভিতরে পাঠায় কি হয়েছে জানার জন্য।
রিফা ভেতরে যায় আফজা তাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাদে সবকিছু শেয়ার করে বলে সে এতদিন ভুল ছিলো। সে ভাবতেও পারেনি তার সাথে এমন হবে, এইজন্যই বড়লোকেএ ছেলেদের সে বিয়ে করতে চায়নি। রিফা তাকে স্বান্তনা দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে আসে। ভুলেও তাকে জানতে দেয় না যে আয়ান এখানেই আছে।
আসলে প্রেগনেন্সির সময় হরমোন ইমব্যালেন্সের কারণে তখন কোনকিছু মাথায় একবার বসে গেলে আর বের হতে চায় না। হিতাহিত জ্ঞান তখন কাজ করে না।
কেবিনের বাইরে এসে আয়ানকে সবটা জানাতেই রাগে তার হাত মুঠো হয়ে আসে। পারছে না লাইকাকে মেরে ফেলতে। আবার রাগ হয় আফজা তাকে বিশ্বাস না করে তৃতীয় একজনকে বিশ্বাস করলো?
রিফা আফজার মোবাইল থেকে সবগুলো ছবি এনে আয়ানকে দেখাতেই তার মাথায় বাজ পড়লো। এইসব দেখলে কার না মাথা খারাপ হবে? আয়ান আফজার বাসায় কল দেয় আফজার অবস্থা জানায়। আর বলে তাদের একটু ঝগড়া হয়েছে তাই আফজা তাদের বাসায় চলে যেতে চাচ্ছে তারা যেনো রাজি না হয় ওকে নিতে। পরে সে নিজেই ওকে নিয়ে যাবে তাদের বাসায়। আফজার মা সবটা শুনে বুঝে আয়ানের কথায় রাজি হয়। কেউ চায় না সন্তানের সংসারে অশান্তি তার উপরে আয়ানের বাবা মা অসম্ভব ভালো মানুষ।
আয়ানকে কেবিনে আসতে দেখে আফজা খুব ক্ষেপে যায়। হাসপাতালে বাবা মা আসলে আফজা খুব জিদ করে তাদের সাথে যেতে। তারা রাজি না হলে সে বলে, সে একবার তাদের কথা মেনে নিয়েছে, এখন যদি তাকে না নিয়ে যায় তাহলে সে হারিয়ে যাবে আর খুজে পাবে না। আফজার বাবা মা তার কথায় ভয় পেয়ে যায়। কারণ সে যা বলে তাই করে। মিতুল।আয়ানকে বুঝায় যেন সে আফজাকে ঠান্ডা হতে একটু সময় দেয়। পরে আয়ান ইশারা করে অনুমতি দেয় তাকে নিয়ে যেতে।
আফজা সেই যে গেলো আর ফিরলো না আয়ানের জীবনে। আয়ান সব সময় তার খোজ নিতো, টাকা পয়সা পাঠাতো শালার হাতে, শশুরবাড়ি যেয়ে বসে থাকতো কিন্তু আফজা দেখা দিতো না। না একবারো আয়ানকে তার পক্ষে কিছু বলার সুযোগ দিলো। এইদিকে আয়ান রেগে যেয়ে লাইকাকে প্রচন্ড মারধোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়। এমন ব্যবস্থা করে সে দেশে আসলেই তাকে এ্যারেষ্ট করা হবে।
আফজাকে অনেকবার মিতুল আর রিফাও বুঝায় কিন্তু সে বুঝতে চায় না, ভাবে তারা বন্ধু আর ভাইয়ের নামে সাফাই গাইছে। দেখতে দেখতে নয়মাস কেটে যায়। আফজার ডেলিভারি ডেট পড়ে। আফজার মেয়ে হয়। আয়ানের বাবা মা, মিতুল রিফা মিতুলের বাবা মা সবাই আসে তাকে দেখতে সবই নরমালে হয় তবুও আয়ান হাসপাতালের সম্পূর্ণ রেস্পন্সিবিলিটি পালন করে মেয়েকে এক পলক দেখে আফজার জ্ঞান হবার আগেই সেখান থেকে চলে যায়।
এরপর সুস্থ হয়ে আফজা আয়ানের নামে ডিভোর্স ফাইল করে। আয়ানসহ দুই পরিবারের মাথায় বাজ পড়ে রীতিমত।
আয়ানের বাবা মা আসে তাকে বোঝাতে, লাভ হয় না কিছুই। সে অটল। পরে আয়ান চিন্তা ভাবনা করে তার এক উকিল বন্ধুকে আফজার কাছে পাঠায় মিতুলের মাধ্যমে। সে নানা ভুজুঙ বুঝিয়ে এইটা সেইটা বুঝিয়ে কোন রকম সেপারেশনে রাজি করায় ডিভোর্সটা হতে দেয় না। (সেপারেশন আর ডিভোর্স আলাদা। সেপারেশনে শুধু আলাদা থাকে কিন্তু বিয়ের সম্পর্কটা থেকেই যায় সেটা যেকোন সময় আবার ঠিক করে ফেলা যায় কিন্তু ডিভোর্স হলে আবার বিয়ে করা ছাড়া উপায় নাই)
আফজা অন্য উকিলের কাছে যেতে চায় কিন্তু ভি আই পির বিরূদ্ধে কেস কেউ লড়তে চায় না। অগত্যা সেপারেশনেই রয়ে যায় আফজা।
এর মাঝে একদিন আফজার এই জিদের কারনে সায়েরীর জীবনটা নষ্ট হবে ভেবে আফজার মা তার সাথে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দেয়, সে ভেবেছিলো রাগ করে আফজা আয়ানের কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু ফল হলো উলটা। সে রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো ঠিকই তবে আয়ানের কাছে নয় উঠলো ভাড়া একটা বাড়িতে।
সব শুনে আয়ান মেয়ের খাতিরে রিফার হোষ্টেলের এক বয়স্ক আয়া রহিমা খালাকে ঠিক করে সায়েরীকে রাখার জন্য আর মিতুলকে দিয়ে আফজাকে একটা জবের ব্যবস্থা করে দেয় যেটা আয়ানেরই ব্রাঞ্চ অফিস। রহিমা খালা রোজ বিকেলে সায়েরীকে নিয়ে হাটার নাম করে আয়ানের সাথে দেখা করিয়ে আনে। এই জন্যই সায়েরী তাকে চিনে আর সায়েরী জানে এখন হাইড এন্ড সেক গেইম চলছে, গেইম শেষ হলে তারা মাম্মাকে সারপ্রাইজ দিবে তাই পাপাহর কথা মাম্মাকে এখন বলা যাবে না। সেও আর মাম্মাকে কখনো বলে নি সে পাপাহকে চিনে। কারণ অনেকবার বাসায় মাম্মার মোবাইলে পাপাহর পিক দেখেছে সে। মাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে পাপা নাকি বিদেশে থাকে? মা একটা বোকা, কিচ্ছু জানে না।
আয়ান গোপনে চারটা বছর মেয়ে আর বউয়ের দেখভাল করে আসছে যা আফজা টেরও পায়নি। কিন্তু আর পারছে না। এইবার জিদ চেপেছে। অনেক তো হলো আর কত? এই মেয়ের একটা ব্যবস্থা এইবার করতেই হবে। বাসায় এনে সোজা প্রেগনেন্ট করে ঘরে বসিয়ে রাখবে দুই বাচ্চা পালতে পালতে তাকে রেখে পালানোর কথা একদম ভুলে যাবে। বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! বয়স হচ্ছে খেয়াল আছে তার? বুড়া বয়সে কাশবে আর বউয়ের সাথে প্রেম করবে না কি? মাঝখান দিয়ে চারটা বছর নষ্ট করে দিলো! এইবার হচ্ছে তোমার! সব শোধ তুলবো দাড়াও না!
সমাপ্ত।।।
