Type Here to Get Search Results !

তোমাকে _ঘিরে (পর্ব _৯)


 #তোমাকে_ঘিরে

#পর্ব_৯



আয়ানের আগ্রহ দেখে আফজা অতীতে হারিয়ে যায় কিছুক্ষনের জন্য।


অতীত: (বিয়ের দিন থেকে শুরু)


বিয়ের পরে যখন মিষ্টি ফল খাওয়ানো আর আয়না দিয়ে মুখ দেখানো শেষ হলে আয়ানের বাবা মা রাতের ডিনার করে আয়ানকে রেখে চলে যায়, এরপরে আফজার মা বলে," আফজা জামাইকে নিয়ে রুমে যাও তাকে ফ্রেশ হতে সাহায্য করো আর তুমিও ফ্রেশ হয়ে এসো ডিনার করতে।"


আফজা চুপচাপ মেনে নেয়। আয়ানকে নিয়ে রুমে যাওয়ার পরে দেখে সে সাথে রাতের ড্রেস নিয়ে এসেছে। আফজার কিঞ্চিৎ সন্দেহ হয় সব আয়ানের প্ল্যান করা না তো? তবে মুখে কিছু বলে না।


"স্যার। ওই পাশে আমার ওয়াশরুম। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।"


"স্যার? এই মেয়ে রুমে কি তোমার বসকে নিয়ে এসেছো নাকি? অফিসে বস তবে এখন মনে প্রাণে পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধুই তোমার স্বামী তুমি আমাকে জান বলে ডাকতে পারো আমি কিন্তু মাইন্ড করবো না। আর তুমি নট আপনি।"


দুষ্টু একটা লুক দিয়ে মুচকি হেসে ওকে ফিসফিস করে বলে আয়ান। রেষ্টরুমে যেতে যেতে আবার ফিরে এসে বলে,


"আর হ্যা। বাসায় নরমালি যা পরো তাই এখন পরো কোন শাড়ি বা সেলোয়ার কামিজ পরতে হবে না আলাদা করে। ডিনার খাওয়া পর্যন্তই তো!"


বলে চোখে টিপে ফ্রেশ হতে চলে যায়। আর আফজা হা করে তার যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকে। আর মনে মনে ভাবে,


" আজ লোকটার হলো কি? আর ডিনার পর্যন্ত মানে কি? যত্তসব!"


দুইজনে ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসার সাথে সাথেই আফজা মায়ের রোষানলের মুখে পড়লো। উনি পারলে মেয়েকে চোখ দিয়েই গিলে খায়। কারণ আফজা টিশার্ট আর প্লাজু পরে গায়ে ওটনা চাপিয়ে এসেছে। আয়ান একবার শাশুড়ির দিকে আর বউয়ের কাচুমাচু মুখ দেখে সবটা বুঝে নেয়। মুচকি হেসে বলে,


" আন্টি রাগ করবেন না আমিই ওকে বলেছি পরতে।"


শাশুড়ি সাথে সাথে ঠান্ডা। হেসে বলে," এসো খেতে বসো।"


খাওয়া শেষে আয়ান বলে," দুকাপ চা করে ঘরে এসো।"


আফজা মাথা নাড়ে। চা নিয়ে ঘরে এসে দেখে আয়ান বারান্দায় বসে আছে। তাকে একটা কাপ দিয়ে আরেক কাপ নিজে নিয়ে পাশে বসে।


আয়ান বলে," আসলে আমি জানি সবকিছুই তোমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি নিরুপায়। আমি কোনকিছুর বিনিময়ে তোমাকে হারাতে চাই নি। তোমার তিনটি শর্ত আমি মেনে নিয়েছি, তাছাড়া যেহেতু তোমার জীবনে কেউ নেই সেক্ষেত্রে শুধু শুধু তিনটা শর্তের জন্য এতদিন ওয়েষ্ট করার কোন মানেই হয় না।"


"তুমি কালকে সকাল থেকে আবার অফিসে যাবে আর সেইখানে আমি শুধুই তোমার বস। 


আমাদের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে লোক লাগবে সেইখানে মেহেদীকে (আফজার ভাই) নিয়ে নিবো ভাবছি। 


আর এখন আমাকে মেনে নেয়ার ব্যাপারটা? প্রথম প্রথম আনইজি সবারই লাগে তারপরে সব ঠিক হয়ে যায়।""


তারপর আয়ান একদম বাচ্চাদের মত মাসুম চেহারা করে আবদারের সুরে বলে, " আফজা! জানো আমি না এখনো কাউকে একটা কিসও করিনি জীবনে সব বউয়ের জন্য জমিয়ে রেখেছি। আজকেও কি আমার এভাবেই থাকতে হবে বেবি? না মানে আজকে তো আমাদের বাসর রাত। কত স্বপ্ন আমার আজকে বউকে উজার করে ভালোবাসবো! তুমি কি আজকে আমাকে কষ্ট দিবে বেবি?"


আফজা তার দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে দেয়। মনের শত দোটানা থাকা সত্ত্বেও জড়িয়ে ধরে আয়ানকে। এবং হঠাৎ সে অনুভব করে মানুষটা একান্তই তার, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে আবদারের, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষ সে। যাকে নিয়ে গতকাল অবধি একটিবারের জন্যেও ভাবেনি যার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলো সে সেই মানুষটি ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে আজ তার শুধুই তার। সবই নিয়তি। 


আয়ান তো বউ তাকে জড়িয়ে ধরেছে সেই খুশিতে বউকে কোলে তুলে ঘরের দিকে রওনা দেয়, বিছানায় শুয়ে আল্লাদি স্বরে বলে," শোন বউ আমরা কিন্তু আজকে থেকেই বাচ্চা প্ল্যান করবো প্রথম আমার প্রিন্সেস চলে আসলে পরে তোমার কথামত আরেকটা বাবু নিবো। এখন কিন্তু কোন নিষেধ শুনবো না। মেয়ে হলে নাম রাখবো সায়েরী আর ছেলে হলে সায়ের।"


এমন আল্লাদি কথা শুনে আফজা হেসে মাথা নেড়ে জড়িয়ে নেয় আয়ানকে। দুজনে পাড়ি দেয় সুখের ভেলায়।


সকালে উঠে রেডি হয়ে দুইজনে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আজকে আয়ান আফজাকে শাড়ি পরতে বলে। রাস্তা থেকে বেলিফুল কিনে তার খোপায় জড়িয়ে দেয় আয়ান।


লিফটে উঠে অফিসে নেমেই আফজা অবাক হয়ে যায়। অফিসের রিসিপশনটা সুন্দর করে সাজানো। ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিতুল আর রিফা।


আসলে রাতেই আয়ান মিতুলকে বলে যে সে বিয়ে করেছে সকালে বউ নিয়ে অফিসে আসছে, সবকিছু যেনো রেডি করে রাখে। বউটা কে তা সারপ্রাইজ রইলো।


মিতুল খুব উৎসাহের সাথে সব আয়োজন করলেও বউ রূপে আফজাকে দেখে তার চেহারার হাসিটা মুছে যায়। তার বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠে, সারাজীবনই আয়ান তার থেকে আগে ছিলো আজ তারই পছন্দ করা মেয়েটিকেও নিজের করে নিলো? আর আফজা? তার নজর আরো উচায় তাই সেদিন তাকে রিজেক্ট করে দিলো? রিফা টিফা সব বাহানা। বাহ রে বাহ! মেয়ে মানুষ।


এইসব ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সামনে এগিয়ে যায় ফুলের তোড়া এগিয়ে আফজাকে অভিনন্দন জানায়। রিফা তো বেজায় খুশি সোজা যেয়ে আফজাকে জড়িয়ে ধরে।


আয়ান সবার উদ্দেশ্যে বলে, "লেডিস এন্ড জেন্টালম্যান। আসলে গতকাল আমাদের বাবা মায়ের সিদ্ধান্তে হঠাৎ করে রাতের বেলাতে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। আগামী শুক্রবার আমাদের অফিস রিসোর্টে আমাদের রিসিপশন পার্টি করা হবে। হোল অফিস আপনারা আমন্ত্রিত পরিরারবর্গ নিয়ে।


আরেকটা ঘোষনা আমি করতে চাই। আপনাদের ম্যানেজার স্যার ছোটবেলার বন্ধু মিতুলকে আমার ছোটবোন রিফা পছন্দ করে। যেহেতু রিফার কোন অভিভাবক নেই, তাই আজ থেকে তাকে ছোটবোন হিসেবে গ্রহন করলাম। আমি তার বড় ভাই আজকে এই অফিসে তাদের বিয়ে দিয়ে শুক্রবার একই সাথে দুই বন্ধুর রিসিপশন করবো ভাবছি। আংকেল আন্টির সাথে আমার কথা হয়ে গেছে, এখন শুধু মিতুলের অনুমতির অপেক্ষায়। আপনাদের কি মতামত?"


এই কথা শুনে পুরা অফিস হই হই করে উঠলো। রিফা তো কেদেই দিলো। আফজা তাকে জড়িয়ে ধরে সামলে নিলো। তখনই লিফট থেকে নেমে মিতুলের বাবা মা সামনে এসে হাজির। অধীর আগ্রহে সবাই মিতুলের দিকে তাকিয়ে। 


মিতুল একবার সবার দিকে তাকায় তারপরে শেষবারের মত আফজার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়িয়ে হ্যা সম্মতি জানায়। পুরো অফিস আবার হর্ষধ্বনি করে উঠে। আয়ান এসে মিতুলকে জড়িয়ে ধরে। তারপরে বাহাদুরকে কানে কানে কিছু বলে গতকালের কাজীকে কল লাগায়, দুই বন্ধুর বিয়ের কাজীও তার একটাই চাই। বাহাদুর নিচে বেইজমেন্টে যেয়ে আয়ানের গাড়ি থেকে বেনারশি শাড়ি আর শেরওয়ানি যা সে গতকাল নিজের বিয়ের শপিংয়ের সময়ই কিনে গাড়িতে রেখে দিয়েছিলো নিয়ে আসে।


এতসব আয়োজন দেখে তো রিফা আর মিতুল অবাক! অভিনব বিয়ে! অফিসে বিয়ে মনে হয় ওদেরই পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম। আফজার কেবিনে নিয়ে রিফাকে আফজা বউ বেশে আর মিতুলকে আয়ান নিজের কেবিনে নিয়ে নিজে হাতে বন্ধুকে বরের বেশে রেডি করলো। দুইজনেই কবুল বলে সাইন করার সাথে সাথে সবাই তাদের উপর ফুল বর্ষন করতে থাকে। আয়ান দুটি আংটি এগিয়ে দেয় তাদের দিকে। মিতুল হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে। আয়ান বলে,


"কি ভেবেছিলি? স্বার্থপরের মত একা একা বিয়ে করবো আর বন্ধুর কথা ভুলে যাবো? জ্বি না বস তা হচ্ছে না। ভালো কতজা শপিংয়ের টাকা তোর বেতন থেকে কাটা হবে।"


মিতুলের চোখে জল। তার বন্ধু তাকে এত ভালোবাসে? অথচ সে কি না কী সব ভাবছিলো তাকে নিয়ে? বেতন কাটার কথা শুনে সামান্য হেসে আংটিটা রিফাকে পরিয়ে দেয় তারপর রিফা মিতুলকে। 


রিফা উঠে আয়ানকে সালাম করতে যায়। বলে," স্যার আজকে আপনি আমার জন্য যা করলেন তা মনে হয় আমার বাবা মা বেচে থাকলেও করতে পারতেন না। আমি সারাটা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। আপনার জন্য আমার জানটাও হাজির। "


" স্যার নয় ভাইয়া। আমার নিজের কোন বোন নেই আজ থেকে তুমি আমার বোন আমার বাসা তোমার বাবার বাসা। এই উল্লুকটা কোনদিন তোমাকে কষ্ট দিলে আমাকে বলবে, কান ধরে টেনে ছিড়ে দিবো।"


রিফা কান্নার মাঝেও হেসে ফেলে। আফজা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতে আয়ানকে। 'মানুষটার মাঝে এইদিকটাও আছে? বন্ধুসুলভ, ভাতৃত্ববোধ, এত ভালোবাসা? নাহ! নিয়তি ভুল করে নি আসলে উপরওয়ালার চয়েজে কোন ভুল থাকে না, ভুল করি আমরা। মনের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছি তোমায় আয়ান, ভালোবাসি আমি তোমাকে।'

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.