মৃত__ভার্সিটি (পর্ব-০৩)
"এতো টাইম লাগে খাবার পরিবেশন করতে?"
একজন মধ্যবয়স্ক লোক ওয়েটারকে ধমক দিয়ে কথাটি বললো।ওয়েটার ধমকে সাথে সাথে মাথা নিচু করে বললো,
-"স্যরি স্যার।ভুল হয়ে গেছে।"
-"যাও বের হও দ্রুত। ওদের খাওয়া শেষ হলে বাকিরাও যেন চলে আসে।"__স্যার গম্ভীর গলায় বললো।
-"জ্বি স্যার।"__ওয়েটার।
বলে ওয়েটার খাওয়ার কক্ষ থেকে বের হয়ে গেল।এদিকে সবাই স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলো।মৃন্ময় তখন বলে উঠলো,
-"স্যার আপনার নামটা..."
মৃন্ময় কিছু বলার আগেই স্যার বলে উঠলো,
-"পিয়াস রায়।"
-"স্যার বাকি স্টুডেন্টরা তো আমাদের সাথে খেতে পারতো।আমাদের পরে কেন তারা খাবে?"__আচমকা প্রশ্ন করে বসলো জীবন।জীবনের কথায় বোধহয় বিরক্ত হলো পিয়াস স্যার।পর পর শীতল গলায় তিনি জবাব দিলেন,
-"ওরা সবাই অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করছে।তাই ওরা পরে খাবে।আর তোমরা তো নতুন তাই তোমাদের আজ তাড়াতাড়ি ই খেতে দেওয়া হয়েছে।আর আগামীকাল সকল পড়া বুঝিয়ে দেওয়া হবে তোমাদের।"
-"গট ইট স্যার।"__মৃন্ময় হেসে বললো।"
কথা শেষ করে সবাই খাবার খাওয়া শুরু করলো।সারা খাবার মুখে দিয়েই ওয়াক থু বলে মুখ থেকে সব খাবার ফেলে দিল।খাবার ফেলে দিতে দেখে নোহা কপাল কুঁচকে আওড়াল,
-"কি হলো সারা খাবার ফেলে দিলি কেন?"
-"এটা কিসের গোশত ভাই?"__সারা কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো।
-"ওয়েটার তো বললো গরুর গোশত।কেন কি হয়েছে"__জীবন।
-"এটা গরুর গোশত কিছুতেই হতে পারে না।এটার স্বাদ একদমই অন্যরকম।আমার কেমন জানি লেগেছে মুখে দেওয়া মাত্রই।"__সারা ভয়ার্ত গলায় বললো।
সারার কথা শুনে সবাই একে একে খাবার মুখে দিয়ে ফেলে দিল।পর পর তিয়াস বলে উঠলো,
-"সত্যি তো এটা তো গরুর গোশত না।"
-"তবে কিসের গোশত?"__জীবন।
-"বুঝতে পারছি না।তবে খাবারটা মুখে নেওয়া যাচ্ছে না।উল্টি আসছে আমার।"__মৃন্ময় চিন্তিত হয়ে বলে।
এরপর সবাই না খেয়েই হাত ধুয়ে খাওয়ার রক্ষ থেকে একসাথে বেরিয়ে গেল।সবাই যে যার রুমে চলে গেল। সারা রুমে এসে ধপাস করে খাটের ওপর বসলো।পর পর সে নিজের বলে উঠলো,
-"এখানে কোনোকিছু ই আমার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।সবকিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে।আমাদের সাথে বাকি স্টুডেন্ট গুলা কেন খেতে আসলো না।আমরা নতুন তাই।না এটা কি করে হতে পারে।আর তাদের সবাইকে কেমন জানি অন্যরকম লাগলো আমার কাছে।কোনো জ্যান্ত মানুষ দেখতে কি এমন হয়?"
ভাবনার মাঝে ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দে সারা চমকে ওঠলো।এবার সে বললো,
-"পানি পড়ার শব্দ মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি যখন ফ্রেশ হয়ে এসেছিলাম পানির ট্যাপ বন্ধ করে গিয়েছিলাম।"
সারা উঠে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো।কিন্তু ওয়াশরুমে এসে দেখে পানির ট্যাপ বন্ধ।স্যার চিন্তিত হয়ে ফের বলে,
-"হয়তো ভুল শুনেছি।"
বলে সারা রুমে এসে পড়লো। রুমে আসতেই আবার ওয়াশরুম থেকে শব্দ আসলো পানি পড়ার।এখন সারা ভয় পেয়ে গেল।সারা শুকনো ঢোক গিলে এদিকওদিক তাকাতে লাগলো।তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল নিয়ে ফোন করলো তীরের কাছে।তীর ফোন রিসিভ করলো না। সারা কি করবে বুঝতে পারছে না। সারা ফোন রেখে ধীর পায়ে আবার ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। প্রথমবারের মতো ই পানির ট্যাপ বন্ধ।সারা বেসিনের কাছে এসে দাঁড়ালো।তারপর সামনে থাকা আয়নার দিকে তাকালো সে।তাকাতেই কেমন ভয় লাগতে শুরু করলো তার।সারার মনে হচ্ছে তার পিছনে কেউ আছে।ভয়ে সারা পুরো শরীর ঘামতে শুরু করলো।সারা ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকালো।সে কাউকেই দেখতে পেল না।সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।এরপর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে শুয়ে পড়লো৷চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে সারা।দশ মিনিট হয়ে গেল সারার চোখে ঘুম নেই।হঠাৎ কিছুর আওয়াজে সারা তড়িত শোয়া থেকে ওঠে বসলো।পর পর ভয়ার্ত গলায় বললো,
-"রাত বারোটায় বাহির থেকে কিসের আওয়াজ আসছে।মনে হচ্ছে হাঁটার আওয়াজ।খুব ভয় লাগছে আমার।এত রাতে কারা হাঁটাহাটি করছে?"
সারা শোয়া থেকে ওঠে ভয়ে ভয়ে ধীর পায়ে দরজার কাছে আসলো।কাঁপা কাঁপা হাতে নিঃশব্দে দরজাটা হালকা খুললো।দরজা খুলে যা দেখলো সারার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল।অনেকগুলো ছেলেমেয়ে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে খাওয়ার রুমটাতে যাচ্ছে।তাদের দেখতে অন্যরকম লাগছে।তাদের স্বাভাবিক মানুষের মতো লাগছে না।চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে আছে।চুলগুলো উসকোখুসকো।চোখ জোড়া রক্তবর্ণ হয়ে আছে।গায়ের রং ফ্যাকাশে।দেখে যেন মৃত মৃত মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে কোনো মৃত মানুষ হেঁটে হেঁটে চলছে।
তারা ধীর পায়ে ঢুলতে ঢুলতে হেঁটে খাওয়ার রুমে প্রবেশ করছে।হঠাৎ তাদের মাঝের একটা মেয়ে হাঁটা থামিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরার আগেই সারা দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিল।আর একটুর জন্য মেয়েটি সারাকে দেখলো না।সারা বুকে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দরজার সাথে পিঠে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।কলিজাটা যেন বের হয়ে যাবে এমন অবস্থা সারার।
সারা দু'পা এগোতেই ফের দরজা ধাক্কানোর শব্দ পেল।সারা ভয় পেয়ে গেল দরজা ধাক্কানোর শব্দে।
ভয়ে তার কান্না পাচ্ছে খুব।সারা মুখ চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।বার বার দরজা ধাক্কাচ্ছে।দরজা ধাক্কানোর পরিমাণ বেড়ে গেছে।সারা কাঁপা কাঁপা শরীর নিয়ে দরজার কাছে আসলো।কাঁপা হাত দিয়ে ধীর গতিতে ফের দরজা খুললো।দরজা খুলে সারা কাউকে দেখতে পেল না।সারা ভয়ার্ত কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
-"ক ,,,,, কে?"
-"আমি।"
পাশ থেকে কারোর শীতল কন্ঠস্বর কানে আসতেই সারার কলিজা কেঁপে উঠল।কন্ঠস্বরটি অদ্ভুত ধরনের।ভয় লাগা শুরু করলো সারার।সারা ভয়ে ভয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটাকে দেখে সারা চমকে উঠলো।সারার মনে সাথে সাথে বলে উঠলো,
-"আরে এটাতো ওই মেয়েটা।বটগাছের কাছে যে মেয়েটাকে দেখলাম।মেয়েটা এখানে কিভাবে?"
এরপর সারা কাঁপা গলায় বললো,
-"ত ,,,, তুমি সেই মেয়েটা না।"
-"হে।আমার তোমায় কিছু বলার আছে।"
-"ব..বলো।কি বলতে চাও তুমি?"
-"তোমরা সবাই...."
মেয়েটি আর কিছু বলার আগেই পিছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
-"এত রাতে তুমি রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে কি করছো?"
পিছন থেকে কারো গম্ভীর কণ্ঠ কানে আসতেই সারা ভয় পেয়ে পিছনে তাকালো।ফের বললো,
-"কি করছো এখানে দাঁড়িয়ে?"
-"আ ,,,, আসলে স্যার রুমে নেটওয়ার্ক পাচ্ছিলাম না তাই রুম থেকে বের হয়েছি যদি নেটওয়ার্ক আসে মোবাইলে তাই।"
-"যাও রুমে যাও।"__পিয়াস স্যার গম্ভীর কণ্ঠে বললো।
সারা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়িয়ে যেতে নিবে তখন পুনরায় পিয়াস স্যার বলে উঠলো,
-"দাঁড়াও।"
সারা ভয় পেয়ে গেল দাঁড়াতে বলায়।সারা দাঁড়িয়ে পড়লো সঙ্গে সঙ্গে ই।পর পর বললো,
-"স্যার কিছু বলবেন?"
-"রাত বারোটার পর আর কখনো রুম থেকে বের হবে না বুঝলে।তখন হচ্ছে ঘুমানোর সময়।বাহিরে বের হয়ে মোবাইলের নেটওয়ার্ক আনার সময় না।বুঝলে?"__পিয়াস স্যার ধমকে বললো।
-"জ ,,,, জ্বি স্যার।"__ভীতু গলায় বললো সারা।তারপর চলে গেল পিয়াস স্যার।সারাও এক মুহুর্ত দেরি করলো না তড়িঘড়ি রুমে প্রবেশ করলো সে।
